সহি উমরাহ গাইড|ওমরাহ করার নিয়ম| কিভাবে সহিশুদ্ধ ওমরাহ করবেন?

সহি উমরাহ গাইড|ওমরাহ করার নিয়ম| কিভাবে সহিশুদ্ধ ওমরাহ করবেন?

পার্ট – ১

উমরাহ গাইড ডাউনলোড করুন এখানে (ছোট পৃষ্ঠা)

উমরাহ গাইড ডাউনলোড করুন এখানে (বড় পৃষ্ঠা)

প্রথমে জেনে নিই ওমরাহ কি ধরনের এবাদত?

উত্তরঃ প্রত্যেক মুসলমান নর-নারীর জীবনে একবার ওমরাহ করা সুন্নত

ওমরাহ’র ফরজ ২ টি :

ইহরাম বাধা/নিয়ত করা

        এবং

তাওয়াফ করা

ওমরাহ’র ওয়াজিব ২ টি :

সায়ি করা (সাফা-মারওয়া)

                এবং

হলক করা বা মাথা মুণ্ডন করা/চুল ছাটা বা ন্যাড়া হওয়া।

আপনি যদি উমরাহ করার জন্য মনস্থির করে থাকেন তাহলে কিছু বিষয় মেনে চলুন।

সুস্থ্য থাকার চেস্টা করবেন কারন আপনি একটা লম্বা সফরে যাচ্ছেন। তার চাপ সহ্য করার মত শারীরিক মানসিক সামর্থ্য থাকতে হবে।

প্রয়োজনীয় কাপড় চোপড় রেডি রাখুন। “অনেক সময় আছে করা যাবে” এমন না ভেবে প্রস্তুত করে ফেলুন।

প্রয়োজনীয় কাপড়চোপড়ঃ

২ সেট ইহরামের কাপড়,

১ টা কাপড়ের বেল্ট,

২জোড়া সান্ডেল,

কম পক্ষে ২ টাপাজামা,

২ টা পাঞ্জাবী, 

২ টা গেঞ্জি, 

২টা টুপি,

২টা লুংগি, ও

১টা তোয়ালে।

তবে সাধারন প্যান্ট-শার্ট এবং ১টা পাগড়িও রাখা যেতে পারে। ভাল ১টা লাগেজ বা ট্রাভেলিং ব্যাগ। জুতা রাখার জন্য ছোট একটা ব্যাগ। 

তবে মহিলাদের ওমরাহ করার জন্য সালোয়ার কামিজ উত্তম।

প্রয়োজনীয় অর্থ কড়িও নিশ্চিত করুন।

  • একটা বিষয় বলি, সেটা হল আপনি হজ্জ্ব বা উমরাহ করতে গেলে সাথে স্ত্রীকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করবেন। কারন আপনি যে কোন সময় যে কোন কাফেলায় যেতে পারলেও আপনার স্ত্রী কিন্তু তা পারবে না। অনেকেই প্রথমে একা হজ্জ্ব বা উমরাহ করে আসার পর বিষয়টি উপলব্ধি করেন। তবে হজ্জ্ব বা উমরাহ’র জন্য যেহেতু যথেষ্ট অর্থ দরকার হয় সে জন্য বিষয়টি আর্থিক সামর্থের সাথেও সংশ্লিষ্ট। 

ভিসা, পাসপোর্ট, হোটেল বুকিং নিজে করা বা এজেন্সির সহযোগীতা নেওয়া

প্রত্যেক নাগরিকের তার দেশের পাসপোর্ট তার অধিকার। আপনার পাসপোর্ট ও হজ্জ্ব/ওমরাহ করতে যাওয়ার আগে নিজেই তৈরী করে রাখতে পারেন। আবার কারও সহযোগীতা নিয়েও করতে পারেন।

passport for Umarah hazz

এর পর সৌদির ভিসা, বিমান টিকেট বুকিং, হোটেল বুকিং এবং সৌদিতে গিয়ে খাওয়ার ব্যবস্থা আপনি নিজে করতে পারেন আবার কোন হজ্জ/ওমরাহ/ট্রাভেলিং এজেন্সির মাধ্যমেও করতে পারেন। পূর্ব অভিজ্ঞতা না থাকার কারনে মানুষ সাধারনত এসব কাজ যথাসময়ে সঠিকভাবে করার জন্য এজেন্সির সহযোগীতা নিয়ে থাকে ।

মনে রাখবেন, আপনি কোন বিমানে যাচ্ছেন বিমানের সিট কোন লেভেলের/শ্রেণীর তার উপর যেমন আপনার উমরাহ’র খরচ কম বেশী হতে পারে তেমনি আপনি মক্কা/মদিনাতে কি ধরনের হোটেলে থাকবেন সেটার উপরও মোট খরচ কম বেশী হবে। স্বাভাবিক ভাবেই হেরেম শরীফের কাছের হোটেলগুলিতে চাপ একটু বেশী থাকে এবং একই মানের হোলেও হেরেম শরীফের কাছের হোটেলগুলির ভাড়া একটু বেশী হয়ে থাকে। এগুলো আপনি আপনার এজেন্সেীর সাথে বিস্তারিত আলাপ করে নিবেন।

Umrah Hazz Biman Agency
mde

ধরুন আপনি মক্কা/মদিনাতে একটি হোটেলের ১ রুমে ১ জন থাকবেন সেক্ষেত্রে অবশ্যই আপনার খরচ বেশী আসবে; আবার একই রুমে যদি আপনি আরো ৩/৪ জনের সাথে শেয়ার করেন সেক্ষেত্রে আপনার খরচ অনেক কমে আসবে।

umrah hajj procedure in bangla
Luxury Hotels Near Haram Sharif

খাবার খরচ যদি এজেন্সি বহন করে তাহলে খাবারের মান নিয়ে আলোচনা করুন। তবে নিজে খাবার ম্যানেজ করে খাওয়াই উত্তম কারন এক্ষেত্রে আপনি আপনার ইচ্ছামত মেনু পছন্দ করতে পারবেন এবং সেটা সাশ্রয়ী হবে বলে আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা আছে।

  • মিকাতঃ

মিকাত একটা সীমারেখা বা বাউন্ডারি যে সীমা অতিক্রম করার আগে ইহরাম বাধতে হবে। যেমন বাংলাদেশ সহ দক্ষিন এশিয়ার দেশসমুহের মিকাত হল ইয়ালালাম পাহাড় যা অতিক্রম করার আগে আপনাকে অবশ্যই ইহরাম বাধতে হবে।অর্থাৎ বাংলাদেশ হতে যখন আপনি উমরাহ করতে যাবেন,তখন আপনি যদি আগে মক্কা পৌছান তবে আপনাকে উক্ত ইয়ালালাম পাহাড় সীমা অতিক্রমের আগেই ইহরামের কাপড় পরে, ২ রাকাত নামায পড়ে ইহরামের নিয়ত করতে হবে। ইহরাম বাধার পরে যেহেতু কিছু বিধি নিষেধ মানতে হয় তাই আপনি চাইলে ইহরামের কাপড় একটু আগে পরলেও ইহরাম বাধা বা নিয়ত একটু পরে করতে পারেন। তবে অবশ্যই মিকাত সীমা অতিক্রমের আগে নিয়ত করে নিতেহবে।

মিকাত কি কোাথায়
মদীনা হতে মক্কায় আসার সময় আমরা এই মসজিদে ইহরাম বাধি
এবং জোহরের সালাত আদায় করি

মদিনা থেকে ওমরা করতে আসলে মিকাত হবে জুলহুলায়ফা নামক স্থান। মদিনা হতে আসার সময় প্রায় সমস্ত বাস/গাড়ি একটা মসজিদে যাত্রা বিরতি করে যেখানে ইহরামের কাপড় পরা এবং ওজু করা এবং নামাজ পড়রা সুব্যবস্থা আছে। বাস, গাড়ি, বিমান বা রেল যে ভাবেই আসুন আগেই ইহরাম বাধার স্থান (মিকাত) জেনে আসুন।

অনেক ক্ষেত্রে বিমান কর্তৃপক্ষ মিকাত অতিক্রমের আগেই ইহরাম বাধার সতর্কতা সময় বলে দিয়ে থাকেন তবে তা সকল বিমান কর্তৃপক্ষ বলেন না, সুতরাং আপনাকে এ ব্যাপারে সাবধান থাকতে হবে।

এক্ষেত্রে আপনি কোন ধরনের ভুল করার ঝুকি না নিয়ে বাংলাদেশ হতে আগে মক্কা গমন করলে আপনি বাসা হতে বা বিমান বন্দর হতে ইহরাম বাধতে পারেন। আর যদি আগে মদিনায় গমন করেন তাহলে বাংলাদেশ হতে ইহরাম বাধার প্রয়োজন নাই। আপনি মদিনা সফর শেষ করে মক্কায় আসার সময় মদিনার হোটেল হতে ইহরাম বাধতে পারেন অথবা জুলহুলায়ফা অতিক্রমের সময় ওখানের কোন মসজিদে আপনি ইহরামের কাপড় পরে ইহরাম বাধবেন।

পার্ট – ২

কিভাবে ইহরাম বাধবেন/ইহরাম বাধার নিয়ম: (ইহরাম বাধা ওমরাহর ১টি ফরজ)

ক।       ইহরামের আগে অবশ্যই পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন হবেন। এগুলোর মধ্যে বিশেষ করে হাত ও পায়ের নক কাটা, গোফ ছেটে ছোট করা, বোগল সহ বিশেষ অংগের লোম পরিষ্কার করা এবং গোসল করা আবশ্যক।

খ)        ইহরামের কাপড়: পুরুষদের জন্য সেলাই বিহীন ২ টুকরা চাদর সদৃশ সাদা কাপড় যার পরনের কাপড়টা একটু ছোট আর গায়ের চাদরটা একটু বড় হতে পারে আবার সমানও হতে পারে। যে কোন রংয়ের কাপড় হতে পারে তবে সাদা হওয়াটা উত্তম।

মহিলাদের জন্য তাদের স্বাভাবিক পোষাকই যথেষ্ট তবে খেয়াল রাখতে হবে মহিলাদের কাপড়-চোপড়ে যেন কোন ধরনের চাকচিক্য প্রকাশ না পায়।ইহরামের কাপড় পরার ভিডিও দেখুন এখানে।

গ)        মিকাতের আগে ২ রাকাত নামায আদায় করে ইহরামের নিয়ত করা। নামায আদায় করা সুন্নত।

ঘ)        মনে রাখবেন, ইহরামের কাপড় পরলেই ইহরাম বাধা হয় না; কাপড় পরে নিয়ত করলে ইহরাম বাধা হয়।

ইহরামের নিয়্যাত :

এ প্রসঙ্গে হাদীসে আসছে: একদা মহিলা সাহাবী দুবায়া বিনতে যুবাইর (রাদিয়াল্লাহু আনহা) তিনি রাসুল (সাঃ) কে বললেন : আমি হজ্ব করতে চাই তবে রোগাক্রান্ত হয়ে যাওয়ার ভয় করছি, তখন রাসুল (সাঃ) তাকে বললেন :”হজ্ব করতে শুরু কর এবং শর্ত করে নাও এবং বলো যদি কোন বাধা দানকারী আমাকে বাধা দেয়, তাহলে যেখানে আমি বাধাগ্রস্থ হবো সেখানেই আমি হালাল হয়ে যাবো” – বুখারী ও মুসলিম।

কাবা শরীফে প্রবেশের দোয়া
কাবা শরীফ

ঙ)        ইহরাম বাধার পর হতে হেরম শরীফ দেখা পর্যন্ত পুরুষরা উচ্চস্বরে তালবিয়া পাঠ করতে হয়। মহিলারা আস্তে আস্তে তালবিয়া পাঠ করবেন।

তালবিয়া:  “লাব্বাইকা আল্লাহুম্মা লাব্বাইক

                        লাব্বাইকা লা-শরিকালাকা লাব্বাইকা

                        ইন্নাল হামদা ওয়ান্নিমাতা লাকাওয়ালমুলক

                        লা-শরিকালাক”।

অর্থাৎ, “উমরাহের জন্য আমি তোমার দরবারে হাজির। হে আল্লাহ! আমি তোমার দরবারে হাজির, আমি তোমার দ্বারে উপস্থিত, তোমার কোন অংশীদার নেই, তোমার দরবারে উপস্থিত হয়েছি। সর্বপ্রকার প্রশংসা ও নেয়ামতের সামগ্রী সবই তোমার, তোমারই রাজত্ব, তোমার কোন অংশীদার নেই।”

ইহরাম বাধা অবস্থায় কিছু বিধি নিষেধ মেনে চলতে হয়ঃ

ক)       পুরুষদের জন্য মাথার সাথে লেগে থাকে এমন কোন কাপড় (যেমন টুপি) পরবেন না, সেলাই করা কাপড় পরবেন না, পায়ের গোড়ালী ঢেকে যায় এমন জুতা ব্যবহার করবেন না । স্যান্ডেল পরা উত্তম।

খ)        মহিলারা বড় চাদর বা ওড়না দিয়ে পর্দা রক্ষা করবেন কিন্তু মুখমন্ডল ঢেকে রাখবেন না। হাত বা পা মোজা ব্যবহার করবেন না।

গ)        সকল প্রকার অশ্লীলতা, ঝগড়া-বিবাদ এবং গীবত না করা যাবে না। অর্থাৎ সকল প্রকার গোনাহর কাজ হতে বিরত থাকবেন।

ঙ)        সহবাস না করা, চুল, দাড়ী, নখ না কাটা, কোন জীব-জন্তু শীকার না করা, এমনকি শীকারীকে সাহায্যও করা যাবে না। মশা-মাছি ও মারা যাবে না। শরীরে বা কাপড়ে সুগন্ধি ব্যবহার করা যাবে না।

পার্ট – ৩

তাওয়াফের প্রস্তুতি:

ইহরাম বাধার পর তালবিয়া পাঠ করতে করতে বিমান বা যে কোন পরিবহনে আপনি মক্কায় আপনার হোটেলে পৌছালেন। হোটেলে গিয়ে গোসল করে পাক-পবিত্র হবেন। এই সময় গোসল করা মোস্তাহাব। তবে গোসল না করলেও চলবে।

হো্টেল/বাসস্থান হতে অযু অবস্থায় তালবিয়া পাঠ করতে করতে কাবা শরীফের দিকে অগ্রসর হতে হতে যখন কাবা শরীফ দেখা যাবে তখন তালবিয়া পাঠ বন্ধ করতে হবে।

এ সময় মোনাজাতের ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আল্লাহর নিকট দোয়া করবেন।

হেরেম শরীফে প্রবেশের নিয়ম ও দোয়া:

”বিসমিল্লাহ ওয়াস্সালাতু ওয়াসসালামু আলা রাসুলিল্লাহ্। আউযু বিল্লাহিল আযিম ওয়া বিওয়াজহিহিল কারীম ওয়া সুলতানিহিল কাদিম। মিনাস শায়তানির রাজিম। আল্লাহুম্মাফতাহলি আবওয়াবা রাহমাতিক”।

অর্থাৎ, “আল্লাহর নামে, আর তার রাসুল (সাঃ) এর উপর দুরুদ পাঠ করছি, আমি বিতাড়িত শয়তান হতে মহান আল্লাহর কাছে তার সম্মানিত চেহারার, এবং তাঁর অনাদি ক্ষমতার ওসীলায় আশ্রয় প্রার্থনা করছি, আল্লাহ তুমি আমার জন্য তোমার রহমতের দ্বারগুলো উন্মুক্ত করে দাও”

এই দোয়া পড়তে পড়তে ডান পা আগে দিয়ে হেরেম শরীফে প্রবেশ করবেন।

তাওয়াফঃ কিভাবে তাওয়াফ করবেন (তাওয়াফ ওমরার ২য় ফরজ)

হেরেম শরীফের ভিতর দিয়ে তাওয়াফের স্থানে পৌছাবেন। তাওয়াফের নিয়ত করবেন; উচ্চারন আবশ্যক নয় মনে মনে করলেই হবে। মূল কাবাঘরের চারটি কর্নারের এক কর্নারে হাজরে আসওয়াদ বা কালো পাথর রয়েছে এবং সেই বরাবর একটি সবুজ বাতির সিগনাল বসানো আছে। হাজরে আসওয়াদ এ চুমু খেয়ে /হাত দিয়ে ছুয়ে”বিসমিল্লাহ আল্লাহু আববার (৩বার)” বলে তাওয়াফ শুরু করবেন। তবে ভিড়ের কারনে হাজরে আসওয়াদ ছোয়া সম্ভব না হলে হাজরে আসওয়াদ ও সবুজ বাতি বরাবর স্থান হতে ”বিসমিল্লাহ আল্লাহু আববার” বলে তাওয়াফ শুরু করতে হবে।

tawaf procedure
তীর চিহ্নিত স্থানে রয়েছে হাজর এ আসওয়াদ
এই সবুজ বাহি ও হাজর-এ আসওয়াদ রেখা হতে তাওয়াফ শুরু

কাবা শরীফ বামে রেখে তাওয়াফ করতে হবে। একটু এগিয়ে মাকামে ইব্রাহিম, তারপর আর একটু এুগয়ে গেলে হাতিম। (হাতিম কাবা শরীফের একটি বর্ধিত অংশ যা ৩টি ধাতব ফলক  দিয়ে চিহ্নিত) পাথর দিয়ে ঘেরা ডি বক্স আকৃতির স্থান যেখানে অবস্থান এবং নামায পড়া অনেক গুরুত্বপূর্ণ এবং সওয়াবের

হাতিম কাবা শরীফের অংশ
স্বেত পাথরের তৈরী ডিবক্স আকৃতির এই অংশ হল হাতিম

এভাবে তাওয়াফ করতে করতে এগিয়ে যেতে হবে। যেতে যেতে কাবা শরীফের আরেকটি কর্নার আসবে যার নাম রুকনে ইয়মেনী। সম্ভব হলে ”বিসমিল্লাহ আল্লাহু আববার” বলে রুকনে ইয়ামেনী স্পর্শ করবেন (চুমু খাবেন না) ভিড়ের কারনে স্পর্শ করা সম্ভব না হলে স্বাভাবিক ভাবে তাওয়াফ করতে থাকবেন। রুকনে ইয়ামানী হতে হাজরে আসওয়াদ পর্যন্ত অতিক্রম করার সময় দোয়া করবেন। এটা দোয়া কবুলের স্থান। প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মাদ (সঃ) “রাব্বানা আতিনা ফিদ্দুনিয়া হাসানাতাও ওয়াফিল আখিরাতে হাসানাতাও ওয়াকিনা আজাবান্নার ওয়াআদ খিলনাল জান্নাতা মায়াল আবরার”

অর্থাৎ, হে আমাদের প্রভু! আমাদেরকে দুনিয়ার কল্যান দান করুন এবং আখিরাতেও কল্যান দান করুন। আর দোযখের অগ্নি থেকে আমাদের বাঁচান [সুরা আল-বাকারাহ: ২০১]

এই দোয়া পড়তেন। বৃত্তাকার পথে এগিয়ে গেলে যেখান হতে শুরু করা হয়েছিল সেখানে অর্থাৎ হাজরে আসওয়াদ ও সবুজ বাতি বরাবর পৌছালে একপাক শেষ হবে।

মনে রাখবেন তাওয়াফ ও নামাজের আদব একই; শুধু তাওয়াফের সময় কথা বলা জায়েজ আছে।

এ জন্য তাওয়াফের সময় আদব রক্ষা করা খুবই জরুরী, কোন ধরনের ধাক্কাধাক্কি বা অন্য কেউ আপনার দ্বারা কষ্ট পায় এমন কাজ করা যাবে না। ছবি তোলা বা ক্যামেরা ব্যবহার না করা।

তবে তাওয়াফের সময় আপনি নিজের মত করে যে কোন নেক দোয়া করতে পারেন। খাস দিলে তওবা এবং ক্ষমা চাইবেন আল্লাহর কাছে।

পুরুষরা তাওয়াফের সময় এত্তেদা করবেন অর্থাৎ গায়ে জড়ানো কাপড় ডান বোগলের নিচ দিয়ে নিবেন (এমন করবেন শুধু তাওয়াফের সময়) তাওয়াফ এর ভিডিও দেখুন এখানে

কিভাবে এত্তেদা করতে হয়
পুরুষদের ইহরামের কাপড় বগলের নীচ দিয়ে এত্তেদা করতে হয়

এভাবে যেখান হতে তাওয়াফ শুরু করেছিলেন সেখানে ঘুরে আসলে এক পাক বা চক্কর হবে। এভাবে সাত চক্কর শেষ করলে একটা তাওয়াফ সম্পন্ন হয়। হাজরে আসওয়াদ (কাল পাথর) ও সবুজ বাতি বরাবর এসে হাজরে আসওয়াদ এ চুমু খাবেন, চুমু খাওয়া সম্ভব না হলে স্পর্শ করবেন স্পর্শ করা সম্ভব না হলে লাঠি জাতীয় কিছু দিয়ে স্পর্শ করনে এবং লঠিতে চুমু খাবেন; তাও সম্ভব না হলে হাজরে আসওয়াদ বরাবর হাত উঠিয়ে ”আল্লাহু আকবার বলে” পরের চক্বর শুরু করবেন। এভাবে সাত চক্কর এবং ৮ বার হাজরে আসওয়াদ এ চুমু খাওয়ার মাধ্যমে তাওয়াফ শেষ করবেন।

তাওয়াফের প্রথম ৩ চক্করে পুরুষরা রমল করবেন; রমল মানে দৌঁড়ানো। ভিড়ের কারনে দৌড়ানো সম্ভব না হলে দৌড়ানোর মত করে হাঁটবেন।

তাওয়াফ চলাকালীন কোন ওয়াক্তের নামাজের ইকামত হলে অবশ্যই নামায আদায় করতে হবে। এবং নামায শেষে যেখান হতে তাওয়াফ থামানো হয়েছিল ঠিক সেখান থেকে আবার তাওয়াফ শুরু করতে হবে।

চক্কর গননায় কোন ভুল বা সন্দেহ হলে, যেমন ৩ চক্কর না ৪ চক্কর এমন মনে হলে যেটা কম অর্থাৎ ৩ চক্কর গননা করে তাওয়াফ শেষ করতে হবে।

কাবা শরীফের একটি বর্ধিত অংশ (ডি-বক্স আকৃতির) যাকে হাতিম-ই-কাবা বলে; এই অংশের বাহির দিয়ে তাওয়াফ করতে হবে।

তবে হাতিম অংশের ভিতরের গুরুত্ব অনেক সম্ভব হলে সেখানে প্রবেশ করে নফল নামায আদায় করতে পারেন।

বিশেষ দ্রষ্টব্যঃ আবেগ আপ্লুত হয়ে অনেক মহিলা হাজীগণ হাজরে আসওয়াদ এ চুমু খাওয়া/ছোয়ার জন্য ধাক্কা ধাক্কিতে সামিল হন,এ বিষয়ে সাবধান থাকা উচিত।

৭ চক্করের সাথে তাওয়াফ শেষ করে মাকামে ইবরাহিমের পিছনে অথবা সেখানে সম্ভব না হলে কাবা শরীফের যে কোন স্থানে ২ রাকাত তাওয়াফের ওয়াজিব নামায আদায় করবেন।

তাওয়াফের ২ রাকআত ওয়াজিব নামাজ কোথায় পড়তে হয়
তাওয়াফের ২ রাকআত ওয়াজিব নামাজ

এই নামাজে প্রথম রাকাতে সুরা কাফিরুন (কুল ইয়া আইয়ুহাল কাফিরুন………) এবং দ্বিতীয় রাকাতে সুরা এখলাস (কুলহু আল্লাহু আহাদ………..) সুরা পড়বেন । এই সুরা মুখস্থ রাখার চেষ্টা করবেন; না পারলে যে কোন সুরা পাঠ করবেন।

তাওয়াফ এর বিস্তারিত ভিডিও এখানে

পার্ট -৪

সায়ি করা/কিভাবে সায়ি করবেন (এটি ওমরাহর১ম ওয়াজিব) :

তাওয়াফের পরপরই সায়ি করতে হয়। তাওয়াফ শেষ করে তাওয়াফের ২ রfকাত নামায পড়ে আপনি পাশের জমজম কুপের পানি খাবেন, হাত মুখ ও মাসেহ/ধৌত করতে পারেন। জমজমের পানি প্রথম বার দাঁড়িয়ে পান করা সুন্নত কিনতু এর পরে বসে পান করবেন।

জমজমের পানি পান করুন
তাওয়াফ শেষে ক্লান্তি দুর করার জন্য এখান থেকে জমজমের পানি পান করুন

ওই এলাকা (মাসা এলাকা বলে)-র নিকট দিয়ে সাফা-মারওয়া পাহাড়ে যেতে হয় সায়ি করার জন্য। মনে মনে সায়ি-র নিয়ত করে নিবেন

saafa pahar saafa hills
সায়ী শুরু সাফা পাহাড় থেকে
সাফা পাহাড় – সায়ী শুরু এখান থেকে
সাফা পাহাড় এলাকা
বুঝা কঠিন এটা সাফা পাহাড় এলাকা

সাফা পাহাড় হতে সায়ি শুরু করতে হয়। সাফা পাহাড়ে দাড়িয়ে কাবার দিকে মুখ করে বিভিন্ন দোয়া দ্বরুদপাঠ করতে করতে মারওয়া পাহাড়ের দিকে অগ্রসর হবেন। ১ম চক্করের শুরুতে কাবার দিকে মুখ করে আল্লাহর বানী সুরা বাকারার ১৫৮ নং আয়াত হতে “ইন্নাচ্ছাফা ওয়াল মারওয়াতা মিন শা’আ-ইরিল্লাহ

অর্থাৎ, ”নিশ্চয়ই সাফা এবং মারওয়া আল্লাহর নিদর্শন সমুহের অন্তর্গত” পড়বেন।

মারওয়া পাহাড়ের দিকে অগ্রসর হওয়ার সময় সবুজ বাতি জালানো কিছু পথ থাকবে; পথের ঐ অংশ পুরুষরা দৌঁড়ে যাবেন কিন্তু মহিলারা স্বাভাবিক ভাবে অতিক্রম করবেন।

সায়ী চলাকালীন এই সবুজ বাতি এলাকায় পুরুষরা দৌড়ে যাবেন

সাফা পাহাড় হতে মারওয়া পাহাড়ে পৌচালে ১ চক্কর এবং মারওয়া হতে সাফা পৌছালে আরেক চক্কর হয়।মারওয়া পাহাড়ে পৌছে আবার দোয়া-দ্বরুদ পড়বেন। আবার মারওয়া পাহাড় হতে সাফা পাহাড়ে পৌছালে ১ সায়ি হয়; এভাবে সাফা হতে মারওয়া এবং মারওয়া থেকে সাফা আসা যাওয়া করলে মারওয়া প্রান্তে পৌছালে ৭ সায়ি সম্পন্ন হয়। এবং দোয়ার মাধ্যমে সায়ি শেষ হয়।

মনে রাখবেন ১ পাহাড় হতে আরেক পাহাড়ে গেলেই ১ চক্কর হয়।

সায়ি চলাকালীন কোন ওয়াক্তের নামাজের ইকামত হলে অবশ্যই নামায আদায় করতে হবে এবং নামায শেষে যেখান হতে সায়ি থামানো হয়েছিল ঠিক সেখান থেকে আবার সায়ী শুরু করতে হবে। সায়ী’র বিস্তারিত ভিডিও এখানে।

চুল কাটা বা মাথা মুন্ডানো বা ন্যাড়া হওয়া (এটি ওমরাহর জন্য ওয়াজিব) ঃ

সায়ী শেষে মাথার চুল পরিস্কার করতে হবে
এভাবে পুরো মাথার চুল পরিস্কার করতে হবে

সায়ি শেষ হলে আপনি বাসা/ঘরে/হোটেলে ‍ফেরার আগেই মাথার চুল কেটে ফেলবেন বা ন্যাড়া হয়ে নিবেন। চুল কাটেন বা মাথা মুন্ডান যাই করেন তা যেন সম্পুর্ণ মাথা হতে হয়। একটু একটু করে চুল কাটলে হবে না যা অনেকে করে। এটা ভুল।

এই মাথা মুন্ডানোর সাথে সাথেই আপনার ওমরাহর সকল কাজ শেষ হল।

আলহামদুলিল্লাহ।

আমি আপনাদের দোয়া প্রার্থী।

বিনীত

মোঃ নিক্তারা হোসেন

মাসজিদ আল-হারম এলাকার কবুতর বিশেষ ক্ষমতার অধিকারী : কথাটি সত্য নয়

মাসজিদ আল-হারম এলাকার কবুতর বিশেষ ক্ষমতার অধিকারী : কথাটি সত্য নয়

আমরা যখন হেরেম শরীফের আশপাশে ঘোরাফেরা করেছি, নামায আদায় করেছি, কেনাকাটা করেছি তখন কাবা শরীফের জাস্ট বাইরের যে চত্বর সেখানে দেখেছি অসংখ্য কবুতর ঘোরাফেরা করে। কবুতর গুলোকে মুসল্লীরা গম এবং অন্যন্য বিভিন্ন ধরনের খাবার দিয়ে থাকে। কবুতরগুলি সে খাবার খায় এবং এখানেই ম্যাক্সিমাম সময় অবস্থান করে।

beautiful pigeon in makkah saudi arabia 2019

শুধুমাত্র কবুতরের নিরাপত্তা এবং ভালোভাবে থাকার জন্য সেখানে কিছু স্পেশাল টাইপের তাঁবুর ব্যবস্থা করা হয়েছে। এগুলো মসজিদ আল-হারম এর বাহিরেই অবস্থিত। আবার প্রধান গেটের বাইরে চত্তরে যেখানে ৫ ওয়াক্ত জামাতে মুসল্লী ও হাজী সাহেবরা নামায আদায় করে সেই জায়গাগুলিতে এই অসংখ্য কবুতর দেখা যায়।

peace pigeons near masjid ul haram makkah

তবে এই কবুতরগুলি কে কেন্দ্র করে বিভিন্ন ধরনের জনশ্রুতি আছে যেমন কেউ মনে করেন যে, এই কবুতর বিশেষ ক্ষমতার অধিকারী। কবুতরের ফেলে দেয়া খাবার খেলে বিভিন্ন রোগ ভালো হয়, বিভিন্ন নিয়তে খেলে বা সেটা ব্যবহার করলে তার আশা পূরণ হয়।

pigeons in makkah,
makkar kobutor

কেউ বলেন যে মক্কার এই কবুতরের খাবার খেলে সন্তান হয়। আসলে এই বিষয়গুলি সবই গুজব এবং অসত্য কথা। তবে এটা ঠিক যে, মক্কার যে হারাম এরিয়া এই এরিয়ার মধ্যে কোন ধরনের জীবজন্তু হত্যা করা হয় না বিধায় এখানে এই কবুতর গুলি কে হত্যা করা হয় না বরং তাদেরকে পরম যত্নে রাখা হয় এবং খাদ্য খাবার দেওয়া হয়।

Masjid Al-haram

 আরো একটা জনশ্রুতি আছে যে মক্কার কাবা শরীফের উপর দিয়ে কখনো কোন প্রাণী উড়ে যায় না, বা বিমান চলে না আসলে এগুলো সবই কল্পকাহিনী বা গুজব।

pigeon field in makkah

 বিমান চলার একটা নির্দিষ্ট রুট থাকে বিধায় ওই নির্দিষ্ট রুটের বাহিরে বিমান চলাচল করতে পারে না। সুতরাং সৌদি কর্তৃপক্ষ যেহেতু কাবার উপর দিয়ে চলার মত বিমানের কোন রুট রাখে নাই, তাই বিমান চলে না। কিন্তু আমি নিজে সেখানে অবস্থান করার সময় লক্ষ্য করেছি এবং ভালভাবে লক্ষ্য করেছি যে কবুতর ও অন্যান্য পাখি ছাড়াও প্রজাপতি কাবা শরীফ এর উপর দিয়ে উড়ে যায়। এমনও দেখেছি যে কাবার গিলাফের উপর ছোট বড় বিভিন্ন ধরনের প্রজাপতি পোকামাকড় এখানে এসে পড়ে এবং সেখানে এই প্রজাপতি এবং পোকামাকড় তাড়ানোর জন্য সবসময়ই পরিচ্ছন্নতাকর্মী নিয়োজিত থাকে।

কাবা শরীফের উপর দিয়ে কি পাখি উড়ে

 তারা এই ছোট বড় প্রাণী গুলি করে হত্যা করে না জাস্ট একটা কিছু দিয়ে ওখান থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। যাহোক, মক্কার কবুতর সম্বন্ধে আলোচনা যাই থাকুক না কেনএই কবুতরের বিশেষ কোনো ক্ষমতা নেই। এটার উচ্ছিষ্ট খাবার খেলে বা ব্যবহার করলে আপনি উপকৃত হবেন, কোন রোগ সেরে যাবে, নিয়ত পূরণ হবে এসব  কথা সত্য না।

 তবে মক্কা, মদিনা তথা সৌদি আরব একটি শুষ্ক আবহাওয়ার পরিচ্ছন্ন দেশ যেখানে অসংখ্য কবুতর দেখা যায়। সৌদি আরবের যেসব জায়গাতে আমি গিয়েছি, হেরা পর্বত সহ অন্যান্য স্থানে গিয়েছি সব জায়গাতেই অসংখ্য কবুতর আমি দেখেছি।

জ্বীন বনাম মাধ্যাকর্ষণ:মদিনার রহস্যময় জ্বীন পল্লীতে কি আছে?

জ্বীন বনাম মাধ্যাকর্ষণ:মদিনার রহস্যময় জ্বীন পল্লীতে কি আছে?

প্রিয় পাঠক, আস্সালামু আলাইকুম।

স্বাগত জানাচ্ছি মদীনার বিশ্ময় পল্লী ওয়াদিয়ে জ্বীন বা জ্বীনের পল্লীতে

মসজিদে নববী হতে প্রায় ৩৭ কিঃমিঃ দুরে এই জ্বীনের পল্লী অবস্থিত।

জ্বীনের পল্লীর সম্পুর্ণ HD ভিডিও দেখুন :

আগের দিন আমরা ভিজিট করেছি মক্কার জাদুঘর এবং আজ আমরা ভ্রমণ করছি ওয়াদিয়ে জ্বীন বা জ্বীনের পাহাড়।

আমরা যাচ্ছি ইনশাল্লাহ আপনাদের সেই অদ্ভুদ বিষয়টি দেখাব যেখানে মাধ্যকার্ষণ শক্তির বিপরীতে কাজ করে। অর্থাৎ কোন বস্তু উপর থেকে নীচে না গিয়ে নীচ থেকে উপরের দিকে যেতে থাকে।

location of jiner polli
আমরা মদীনার মসজিদ এ নববী’র নিকট হতে রওনিা হই জ্বীনের পল্লীর উদ্যেশ্যে

how to go to walide jin
আমরা ছুটে চলছি মদীনার পথে

ওয়াদিয়ে জীন যেতে আমরা সুন্দর রাস্তা দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছি। আসলে পুরো মদিনা একটি পরিচ্ছন্ন শহর, যেন ছবির মত।শুধু হোটেল আর হোটেল।

আমরা প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ) এর শহর, হোটেলের শহর মদীনা মনোয়ারা হতে অনেকটাই দুরে যাচ্ছি, যাচ্ছি ওয়াদিয়ে জীন বা জীনের পল্লীতে। রাস্তার দুপাশে শুধু পাহাড় আর পাহাড়। আর আছে সারি সারি খেজুর গাছ। আমি সিওর না এগুলো কি মদিনার বিখ্যাত “আজওয়া” খেজুর নাকি অন্য কোন জাতের।

jiner pahar
রাস্তায় সারি সারি খেজুর গাছ

যাহোক আমরা এগিয়ে যাচ্ছি জীনের পাহাড়ের দিকে। আমাদের ড্রাইভারের বয়স বেশ বেশী হলেও তার গাড়ির গতি ৯০-১১০ কিঃমিঃ এর মধ্যে উঠা নামা করছে।

saudi arab madinah jiner pahar
ঐতিহাসিক ওহুদ পাহাড়ের কিছু অংশ

আমার হাতের ব্যাগ দেখিয়ে তিনি মজা করে বল্লেন” ব্যাগ ভরে জ্বীন নিয়ে আসব” হা হা হা।

wadi e jinn saudi arabia

চারিদিকে শুধু পাহাড় আর পাহাড়। আর পাহড়ের পাথর কোথাও কালো কোথাও লাল হয়ে আছে।

জ্বীনের পাহাড়ের রহস্য

আসলে শতাব্দীর পর শতাব্দী এই পাহাড় রোদে পুড়ছে। কবি যেন যথার্থই বলেছেন:  

”কখনও পাহাড় যেখানে পাথর

চিরদিন জেগে থাকে ……….. ”

একথা সৌদি আরবের জন্যই যেন লেখা।

যাহোক এগিয়ে যাচ্ছি জীনের পল্লীতে।

জীনের পল্লীতে যাওয়ার পথে আমরা মদীনা শহরের অন্যান জিনিস এবং শহরের বাইরের কিছু দৃশ্য দেখব ইনশাল্লাহ।

রহস্যময় জিনের পাহাড়
পাহাড় আর নীল আকাশের অপূর্ব সমন্বয়

আমরা ঐতিহাসিক ওহুদ পাহাড়ের পাদদেশ দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছি। আপনারা জানেন ইসলামের ইতিহাসে সেই ওহুদ যুদ্ধের কথা যেখানে মুসলমানরা জিততে জিততে হেরে যায় এবং ব্যাপক ক্ষয় ক্ষতি হয় মুসলমানদের।

wadi e jinn
দুম্বার হাট

সময় বিকাল। পরিস্কার নীল আকাশ। কনকনে শীতে আমরা এগিয়ে যাচ্ছি। পাহাড়ের পিছনের নীল আকাশ খুব সুন্দর লাগছে।

dumba soudi arabia

আপনারা নিশ্চয়ই লক্ষ্য করছেন আমরা রাস্তার ডানপাশ দিয়ে যাচ্ছি যেটি সৌদির নিয়ম, বাংলাদেশের ঠিক বিপরীত।

দেখতে পাচ্ছেন এখানে বেশ দুম্বা/ভেড়া এবং ছাগলের সমাহার দেখা যাচ্ছে। এই এলাকায় গবাদি-পশুর হাট বসে এবং কেনা বেচা হয়। এই সুযোগে গাড়িতে বসেই আমরা দুম্বা, ভেড়া, ছাগল আর উট দেখছি।

যাওযার পথে অনেক পশু খাদ্য গুদাম চোখে পড়ছে। যেখানে থরে থরে সাজানো রয়েছে পশুখাদ্য, ঘাস। প্রসংগত, এই খাদ্যগুলিও বিদেশ হতে আমদানী করা হয়ে থাকে। এ কারনে পরিবহনের সুবিধার্থে ঘাশগুলিকে অনেকটা কেক সদৃশ করে প্যাকড করা হয়েছে, আপনারা দেখতে পাচ্ছেন।

জীনের পাহাড়ের রহস্য
পশুখাদ্যের গুদাম

যাহোক, এগিয়ে যাচ্ছি ওয়াদিয়ে জীন বা জীনের পল্লীতে।

এখন কিন্তু আমরা মদীনা শহর হতে বেরিয়ে যাচ্ছি এবং এখান হতে মুলত গ্রাম এলাকা শুরু।

আরো একটা জিনিস লক্ষ্য করছি আমরা মদীনা হতে যতটা দুরে যাচ্ছি ততটাই নীচে নামছি। অর্থাৎ মদীনা হতে আমাদের গন্তব্য জীনের পল্লী অনেক নীচের দিকে অবস্থিত।

পাহাড় আর পাহাড়। আসলে সৌদিতে প্রায় সব রাস্তাই পাহাড় কেটে বা পাহাড়ের নীচ দিয়ে গেছে।

how camel slaughtered
মদীনার উট ও এক নারী দর্শনার্থী

দেখতে পাচ্ছেন একটি সীর্ণকায় উট। আসলে আমাদের বাংলাদেশে যেমন একটা জীর্ণ-শীর্ণ গোড়ার সামান্য রাইড দিয়ে কিছু টাকা আয় করে এখানে এমনটা উট দিয়ে কেউ কেউ করে। এটা তেমনই।

যাহোক, অবশেষে চলে এলাম জীনের পল্লীতে।

জ্বীন পাহাড়
জ্বীনের পল্লী

আসলে আমি এধরনের বিষয় আগেও শুনেছি কিন্তু আমি দেখে বিশ্বাশ করতে চাই। তাই পানি ভর্তি বোতল ছেড়ে দিয়ে পরীক্ষা করছি। এবং দেখতে পাচ্ছেন আমরা যে উচু দিক হতে এসেছিলাম বোতলটি নীচু হতে সেই উচুদিকে গড়িয়ে যাচ্ছে। সত্যিই নীচু হতে উচুতে যাচ্ছে কেন যাচ্চে তা কেউ জানে না।

anti gravitation
জ্বীনের পল্লীর রাস্তা

এখন লক্ষ করুন আমরা ফেরত যাচ্ছি এবং এখন কিন্তু সেই নীচ হতে উচু রাস্তার দিকে আমাদের গন্তব্য। এবং গাড়ি চলছে কোন ইঞ্জিন ষ্টার্ট ছাড়া।

how gravity works

লক্ষ্য করুন স্পষ্টতঃই গাড়ি উপরের দিকে উঠছে কোন শক্তি ছাড়া। এটাই জীনের পল্লীর কারিশমা

secret of jiner pahar

যাহোক, আমরা এখন নীচু এলাকা হতে উচু এলাকার দিকে এগিয়ে যাচিছ গাড়ির কোন ইঞ্জিন শক্তি খরচ না করেই। এভাবে চলবে প্রায় ৩/৪ কিঃমিঃ। তারপর গাড়ি চলবে স্বাভাবিক গাড়ির শক্তিতে।

আল্লাহ হাফেজ

মক্কা জাদুঘর:নবী রাসুলদের ব্যবহৃত আশ্চর্য জিনিসপত্র

মক্কা জাদুঘর:নবী রাসুলদের ব্যবহৃত আশ্চর্য জিনিসপত্র

আস্সালামু আলাইকুম।

আলহামদুলিল্লাহ, আমরা গতকাল উমরাহ শেষ করে আজ আসছি জিয়ারাহ’ তে। আমাদের গন্তব্য মক্কা জাদুঘর (Makkah Museum Visit) পরিদর্শন। আমাদের টিমে আছি ১৫ জন। মসজিদ-আল-হারম হতে মক্কা মিউজিয়াম এর দুরত্ব মাত্র ৬-৭ কিলোমিটার। কোন ফি ছাড়াই প্রবেশ করতে পারেন মক্কা জাদুঘরে।

মক্কা জাদুঘরের সম্পূর্ণ HD ভিডিও দেখুন :

location of makkah Museum
Main Gate of Makkah Museum

জাদুঘরের গেটে আসছি জাদুঘর পরিদর্শন করার আশায়। কিন্তু দুর্ভাগ্য আমাদের। আজ সোমবার; শুধুমাত্র মহিলাদের জন্য খোলা। সপ্তাহের বাকি দিনগুলোতে পুরুষরা প্রবেশ করতে পারবেন। তো কি আর করা আমাদের কাফেলার মহিলা সদস্যরাই জাদুঘরের ভিতরে প্রবেশ করেন, আর আমরা গেটের বেইরে অপেক্ষা করি।

how to go to mecca Museum
In Front of Makkah Jadughor

আগের আল-আজহার প্যালেস ‘ টিকে জাদুঘরে রুপান্তর করা হয়েছে, যার আয়তন ৩৪৩৫ বর্গ মিটার। বাদশাহ আব্দুল আজিজ এর নির্দেশে এই জাদুঘর নির্মান কাজ শুরু হয় ১৩৬৫ আরবী হিজরীতে এবং শেষ হয় ১৩৭২ সালে। এখানে সৌদি আরবের প্রাক-ইসলামী ইতিহাসের প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কারগুলি প্রদর্শন করা হয়।

এখানে গুরুত্বপূর্ণ  চিত্র থেকে শুরু করে নানা ঐতিহাসিক বস্তু সামগ্রীর সংগ্রহ রয়েছে। রয়েছে হরেক রকম ক্যালিওগ্রাফি

holy things in makkah Museum
Calligraphy In the Makkah Museum
মক্কা জাদুঘরের ক্যালিওগ্রাফি
জাদুঘরের ক্যালিওগ্রাফি

 ‘লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক’- মক্কা নগরীর পবিত্র কাবা শরীফ বা আল্লাহর ঘর থেকে হেদায়েতের ডাক আসে প্রতিবছরই। লক্ষ লক্ষ মুসলিম হজ্ব মৌসুমে এবং সারা বছর উমরাহ’র উদ্দেশ্যে একত্রিত হয় পবিত্র কাবা শরীফে। হজ্ব এবং উমরাহর মূল আনুষ্ঠানিকতা শেষে মুসল্লিরা অনেকটা সময় পান। এসময় ইবাদতের সাথে সাথে ইসলামিক নানান ঐতিহাসিক স্থানগুলোও দর্শন করতে পারেন। 

মক্কা জাদুঘরের সময় সূচী
মসজিদ এ নববীর ডিজাইন

শুধুমাত্র ধর্মপ্রাণ মুসল্লি নয় বরং ভ্রমণপিয়াসু যে কেউই ভ্রমণ করতে পারে পবিত্র মক্কা নগরী। হজ্বে বা ভ্রমণে গেলে ঘুরে দেখতে পারেন মক্কা জাদুঘর। কাবা শরিফের বেশ কাছেই মক্কা জাদুঘর। জাদুঘরটি সকলের জন্য উন্মুক্ত এবং প্রবেশের জন্য কোনো টিকিট কাটা লাগে না। 

তবে প্রতি সপ্তাহে সোমবার শুধমাত্র মহিলাদের জন্য খোলা থাকে। তো আমরা এই সোমবারেই এখানে এসে উপস্থিত হয়েছি। যেহেতু বিষয়টি জানা ছিল না তাই শুধমাত্র আমাদের মহিলা সদস্যরাই ভিতরে পরিদর্শনের সুযোগ পায় আর আমরা বাহিরে অপেক্ষা করা ছাড়া আর কিছু করার ছিল না।

দুই তলা বিশিষ্ট মক্কা জাদুঘরে সংরক্ষিত  রয়েছে সৌদি আরবের প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী পোশাকপরিচ্ছদ, আসবাবপত্র, বাদ্যযন্ত্র ইত্যাদি।

তবে এখানে সংরক্ষিত সবকিছুই কাবা কেন্দ্রীক। এছাড়াও রয়েছে প্রাচীন সৌদি আরবে ব্যবহৃত ধাতব মুদ্রার বেশ বড় সংগ্রহশালা।

মূলত মক্কা জাদুঘর কাবা শরিফমসজিদে নববীর বর্তমান রূপের আগে বিশেষ করে তুর্কি আমলের ব্যবহৃত জিনিপত্রের সংরক্ষণাগার। বিশেষ করে কাবাকেন্দ্রীক প্রতিটা জিনিস এখানে সংরক্ষিত আছে।

জাদুঘরে প্রবেশের মুখে রাখা হয়েছে ২০৫০ সাল নাগাদ বর্তমান সৌদি সরকারের মহাপরিকল্পনার অংশ হিসেবে কেমন হবে মসজিদে হারাম মক্কার অবয়ব। তবে এখানে শুধুমাত্র মক্কা নয় বরং মক্কাসহ মদিনা  সভ্যতারও অনেক কিছু সংরক্ষণ করা আছে।

master plan for makkah city and masjid al haram
Master Plan For Makkah City And Masjid Al Haram BY 2050

বিশ্বের এক অনন্য নিদর্শন হলো জমজম কূপ। আরবি ভাষায় জমজম শব্দের অর্থ ‘ অঢেল পানি’। মক্কা জাদুঘরে রয়েছে ১২৯৯ হিজরি সনের জমজম কূপের একটি নিদর্শন এবং জমজম কূপের থেকে পানি উত্তোলনের পুরনো যন্ত্রপাতি, জমজম কূপের পানি বিতরণের চিত্রও সংরক্ষিত রয়েছে অতি যত্নে।

Ancient Zam Zam Kup
Ancient Zam Zam Kup

এছাড়াও রয়েছে প্রাচীন আমলের অনেকগুলো পবিত্র কোরআনের কপি যা অত্যন্ত সুন্দরভাবে কাচের ঘরে সংরক্ষণ করা হয়েছে। জেনে আশ্চর্য হবেন যে, অপূর্ব সুন্দর  কারুকাজ এবং রকমারি ডিজাইনের লেখা স্বর্ণ ও রুপার রংমিশ্রিত কালিতে এসব লেখা কিন্তু কোন প্রেস বা কম্পোজ করা নয়। 

সবচেয়ে পুরাতন কোরনের কপি
সবচেয়ে পুরাতন কোরনের কপি

সবই হাতে লেখা যদিও আপনার দেখে তা মনে হবে না। সাথে এক দৃষ্টিতে থাকলেও আপনার মুগ্ধতার রেশ কাটবে না। এসব কোরআনের কপিগুলো খুবই প্রাচীন কোনোটি ৩৮১ হিজরি সনের, আবার কোনোটি ৬৮৫ সনের।

তবে মক্কা জাদুঘরের সবচেয়ে দামী সংগ্রহ হলো- কোরআন মাসহাফে উসমানির একটি কপি যা হজরত উসমান (রা.)-এর আমলের হাতে লেখা।

খলিফা হযরত উসমানের (রাঃ) সময়ের পবিত্র কোরআন
খলিফা হযরত উসমানের (রাঃ) সময়ের পবিত্র কোরআন

মক্কা জাদুঘরে ঘুরতে ঘুরতে একসময় দেখতে পাবেন কাবা ঘরের স্থাপনায় ব্যবহৃত বিভিনন্ন সময়ের নানারকম স্থাপত্য শৈলীর অনেক নমুনা,আরবী আয়াত উৎকীর্ণ পাথর খণ্ড, প্রাচীন কাবা শরীফের বিবর্তনকালের অনেক ছবি রয়েছে।

বেশ কিছু ক্যালিওগ্রাফিও অত্যন্ত সুন্দর ভাবে দেয়ালে সাজানো রয়েছে যা প্রাচীন  মুসলিম সভ্যতার ঐতিহ্যবাহী নিদর্শন হিসেবে সংরক্ষণ করা হয়েছে।

এছাড়াও সংরক্ষণ করা আছে প্রাচীন কাবা ঘরের ব্যবহৃত দু’টি কাঠের দরজা, আরো আছে ৯৬৬ হিজরি সনে কাবার দরজার বিশেষ নকশা যা অটোম্যান শাসক সুলতান সোলাইমান বিন সালিম খাঁন দিয়েছিলেন।

আগের দিনের মিনারের ডিজাইন, কাবার অভ্যন্তরের কাঠের বাক্স যা ১৪০৪ হিজরি সনে ব্যবহৃত হয়েছিলো।

আরো আছে কাবার গিলাফ (যদিও প্রতি বছর কাবা শরীফের গিলাফ পরিবর্তন করা হয় এখানে প্রাচীন একটি গিলাফ দেখতে পারবেন), হাতে কাবার গিলাফ বুননের যন্ত্র, কাবার ভেতরে ব্যবহৃত কাঠের খুঁটি যা ৬৫ হিজরি সনে ব্যবহৃত হয়েছিলো এবং নির্মাণ করেছিলেন আবদুল্লাহ ইবনে জুবায়ের

gilaf of kaba sharif
কাবার গিলাফ

পবিত্র পাথর হাজরে আসওয়াদ বা কালো পাথর সংরক্ষণের জন্য বানানো রূপা দ্বারা নির্মিত বিশেষ ফ্রেম রয়েছে।

hazre aswad black stone
হাজর এ আসওয়াদ বা কালো পাথর

আরো দেখতে পাবেন কাবার ছাদের পানি নিষ্কাষণের জন্য বিশেষ পাইপ

১২৪০ সনে কাবায়  ব্যবহৃত কারুকাজ সম্পন্ন বিশেষ সিঁড়ি যা কাঠ দিয়ে তৈরি।

the holy things of baitullah
কাবা ঘরের ভিতরের সিড়ি

অনেক দূর থেকে সময় দেখার প্রাচীন আমলের বিশাল ঘড়িও সংরক্ষণ করা আছে মক্কা জাদুঘরে।

মক্কা জাদুঘরের পাশে উম্মুল জুদ নামক একটি জায়গা আছে যেখানে কাবার গিলাফ তৈরির কারখানা স্থাপিত। স্থানীয় ভাষায় গিলাফ তৈরির কারখানাকে কিসওয়া কাবা বলা হয়। ১৩৯৭ হিজরি সনে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে গিলাফ তৈরির এই অসাধারণ কারখানাটি। যদিও এখানে সর্বসাধারণের প্রবেশের অনুমতি নেই। তবে বাইরে থেকেও অনেক কিছুই দেখে আত্নতৃপ্ত হওয়া যায়।

একটু সামনেই রয়েছে মক্কাভিত্তিক আন্তর্জাতিক সেবা সংস্থা রাবেতা আলম আল ইসলামি বা মুসলিম ওয়ার্ল্ড লীগ অফিস।

Our Social Channels: Youtube

Our Blog : VromonBangla

Facebook Page : Travel2life

https://twitter.com/Travell2Life